পোখারা থেকে কাঠমান্ডু

পর্যটন খাতে বড় ধাক্কা

পর্যটন খাতে বড় ধাক্কা

নেপালে সোমবার ও মঙ্গলবারের সহিংস বিক্ষোভ দেশটির জন্য এনে দিল নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক প্রচার—তবে বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত শরৎকালীন পর্যটন মৌসুমে এই প্রচার মোটেও কাঙ্ক্ষিত ছিল না। কারণ এ সময়েই নেপালে বার্ষিক পর্যটকের এক-তৃতীয়াংশের বেশি আগমন ঘটে।

কাঠমান্ডুতে মৃত্যু, ধ্বংসযজ্ঞ ও অরাজকতার দৃশ্য টেলিভিশন ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় হোটেল বুকিং বাতিলের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষত আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের হোটেলে আগুন লাগার ভিডিও বিশ্বজুড়ে শঙ্কা তৈরি করেছে। শনিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে এ খবর দিয়েছে নেপালি টাইমস।

২৪ ঘণ্টা ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় হাজার হাজার যাত্রী কাঠমান্ডু ও অন্যান্য শহরে আটকা পড়েন। দশইন-তিহার উৎসব উপলক্ষে দেশে ফিরতে থাকা নেপালি প্রবাসীরাও বিপাকে পড়েন।

সংকটে আশার বার্তা

যদিও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি, নেপালের পর্যটন খাতের কর্মকর্তারা আশাবাদী যে দেশটি আগের মতোই সংকট কাটিয়ে উঠবে। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের (এনটিবি) প্রধান নির্বাহী দীপক রাজ জোশী বলেন,

‘সংঘাত, মহামারি ও ভূমিকম্প—সবকিছু সত্ত্বেও আমরা সব সময় ঘুরে দাঁড়িয়েছি। তবে ঘনঘন এমন পরিস্থিতি আমাদের গন্তব্য হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতাকে আঘাত করছে।’

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নেপালে ৭ লাখ ৩৬ হাজারেরও বেশি বিদেশি পর্যটক এসেছেন, যা মহামারির আগের স্তরে ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছিল। দেশটিতে হিলটন, ম্যারিয়ট, হলিডে ইনসহ আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের নতুন হোটেল চালু হয়েছে।

সেনাবাহিনী মোতায়েনের পর থেকে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে। বিমানবন্দর আবার সচল হলেও আগত যাত্রীদের শহরে প্রবেশের সময় পুড়ে যাওয়া সরকারি ভবন ও গাড়ির ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ছে। বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজার বিদেশি পর্যটক নেপালে আছেন। অনেকে ইতোমধ্যেই এভারেস্ট ও অন্নপূর্ণা অঞ্চলে ট্রেকিংয়ে রয়েছেন, কেউ রয়েছেন পোখারা, চিতওয়ান ও লুম্বিনিতে।

জোশী জানান, ‘বেশিরভাগ পর্যটক নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভ্রমণ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিমানবন্দর খোলা থাকায় ধীরে ধীরে আটকে পড়া যাত্রীদের সমস্যা কাটবে।’

এনটিবি বিমানবন্দর থেকে হোটেল পর্যন্ত শাটল বাস চালু করেছে, যা কারফিউ চলাকালেও অনুমতি নিয়ে যাতায়াত করেছে।

বিনিয়োগে ধাক্কার শঙ্কা

তবে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে এই সহিংসতার নেতিবাচক প্রভাব অনিবার্য। বিশেষ করে পোখারায় বেশ কয়েকটি সরকারি ভবন ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হোটেল-রিসোর্টে হামলার ঘটনা ঘটেছে। পোখারার মান্ত্রা ঠাকালি, হোটেল সরোবর, হোটেল পোখারা গুডউইল এবং নতুন চালু হওয়া বাগইঞ্চা রিসোর্ট ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়।

এনটিবির গণ্ডকি প্রদেশের প্রধান মনি রাজ লামিছানে জানান, সহিংসতা মূলত পোখারার নিউ রোড এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। পর্যটকদের আগে থেকেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘আমরা হয়তো ১০-১৫ শতাংশ ব্যবসা হারাবো। তবে পর্যটকদের অনুরোধ করছি বুকিং বাতিল না করে স্থগিত রাখতে। নেপাল সব সময় পর্যটকদের জন্য নিরাপদ, সহিংসতার লক্ষ্য কখনো তারা হয় না।’

পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, হিলটন হোটেলসহ আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের স্থাপনা পুড়ে যাওয়ার ছবি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াতে পারে। নেপাল আগে থেকেই দুর্নীতি ও জটিল বিনিয়োগ পরিবেশের কারণে সমালোচিত।

জোশীর সতর্ক বার্তা—‘উচ্চমানের পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো পরিবেশ তৈরি করতে যে বিনিয়োগ দরকার, তা এখন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।’